ছোলার ক্ষতিকর দিক - ছোলা খাওয়ার উপকারিতা

ছোলা খাওয়ার ভালো দিক সম্পর্কে তো আমরা কম বেশি সবাই জানি, কিন্তু ছোলার ক্ষতিকর দিক সম্পর্কে আপনার কি কোনো ধারণা আছে? না থাকলে জেনে নিন এখনই-
ছোলার ক্ষতিকর দিক
রমজান মাসে ইফতারে প্রত্যেকটা বাঙালির ঘরে আর পাঁচটা খাবারের সাথে ছোলা থাকবেই। নানান পুষ্টিগুণে ভরপুর এই খাবার হৃদরোগের ঝুঁকি থেকে শুরু করে কোষ্ঠকাঠিন্যের মতো বিভিন্ন ধরনের রোগের বিরুদ্ধে কাজ করে। এতে রয়েছে প্রচুর পরিমাণে প্রোটিন ও ফাইবার ।

ছোলার বিভিন্ন ধরনের উপকারিতা থাকা সত্ত্বেও কিছু কিছু ক্ষেত্রে এই খাবার আমাদের স্বাস্থ্যকে ঝুঁকিতে ফেলে। ছোলার অসংখ্য পুষ্টিগুণ ও উপকারী দিকের পাশাপাশি আজ এর ক্ষতিকর দিক সম্পর্কেও জেনে নিন।

ছোলা খাওয়ার উপকারিতা

প্রচুর পরিমাণে প্রোটিন, ভিটামিন এ, ভিটামিন বি, ক্যালসিয়াম, কার্বোহাইড্রেট সহ বিভিন্ন ধরনের পুষ্টিগুণে ভরপুর একটি খাবার হচ্ছে ছোলা। ওজন বাড়াতে কাঁচা ছোলা বেশ উপকারী ভূমিকা পালন করে। তবে রান্না করা ছোলাও কোনো অংশে কম নয়, এতেও রয়েছে বেশ পুষ্টিগুণ।

কাঁচা ছোলা খাওয়ার উপকারিতা

কাঁচা ছোলা আমাদের বডি মাসেল বৃদ্ধি, শক্তি বৃদ্ধি ও শরীরে বিভিন্ন ধরনের পুষ্টি সরবরাহ করে থাকে। প্রতি ১০০ গ্রাম কাঁচা ছোলায় থাকে ৬৫ গ্রাম কার্বোহাইড্রেট, ১৮ গ্রাম প্রোটিন। তাছাড়া এতে থাকা ভিটামিন এ, বি-১ বি-২ বি-৬ ও ভিটামিন সি, কপার, সালফার, আয়রন, খনিজ লবণ, ক্যালসিয়াম, ফসফরাস, ম্যাগনেশিয়াম, ক্যালরি এবং ফাইবার আমাদের শরীরের জন্য বেশ উপকারী ভূমিকা পালন। কাঁচা ছোলা খাওয়ার অনেক অনেক উপকারিতা রয়েছে। যেমন-
  • ছোলাতে থাকা ফাইবার বা আঁশ কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করতে সাহায্য করে ‌ এটি হজমও হয় তাড়াতাড়ি।
  • এতে থাকা প্রচুর পরিমাণে ক্যালরি আমাদের শরীরে সঞ্চিত থেকে দীর্ঘ সময় ধরে শরীরকে শক্তি যোগান দেয়।
  • এটি স্নায়ু দুর্বলতা ও মেরুদন্ডের ব্যথা কমাতে সাহায্য করে‌। কেননা এতে প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন বি থাকে।
  • কাঁচা ছোলা ভিজিয়ে আদার সাথে খাওয়ার মাধ্যমে আমাদের শরীরের প্রোটিন ও অ্যান্টিবায়োটিকের চাহিদা পূরণ হয়।
  • শরীরকে প্রয়োজনীয় শক্তি সরবরাহ করে কর্মক্ষম করে তোলে।
  • কাঁচা ছোলা শরীরের অপ্রয়োজনীয় কোলেস্টেরল কমাতে সাহায্য করে।
  • এটি রক্তচাপ কমিয়ে হৃদরোগের ঝুঁকি কমায়।
  • কাঁচা ছোলা খেলে এতে থাকা ক্যালসিয়াম, ম্যাগনেশিয়াম ও আঁশ শরীরের হাড় শক্ত করে।
  • এটি হজম শক্তিকে বাড়িয়ে দেয়।
  • রক্তে চর্বির পরিমাণ কমায়‌।
  • হাত পা -এর জ্বালাপোড়া কমাতে কাঁচা ছোলা সাহায্য করে।
  • এতে থাকা শর্করা সহজে গ্লুকোজে পরিণত হতে পারে না, তাই এটি ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য বেশ উপকারী একটি খাবার। এটি ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে।
  • খাদ্য নালীকে পরিষ্কার রাখার মাধ্যমে খাদ্য নালীর ক্যান্সারের ঝুঁকি কমায়।
  • দেহের রক্ত চলাচল বৃদ্ধি করে।
এছাড়াও আরও নানান ধরনের উপকারী গুণে ভরপুর কাঁচা ছোলা।

কাঁচা ছোলা খাওয়ার নিয়ম

রাতে ভিজিয়ে রেখে প্রতিদিন সকালে খালি পেটে এই কাঁচা ছোলা খেলে এটা আপনার স্বাস্থ্যকে বেশ উপকৃত করবে। কাঁচা ছোলা এমনিতে খেতে ভালো লাগে না, তাই আপনারা চাইলে এর সাথে সামান্য পরিমাণে লবণ ও মধু মিশিয়ে খেতে পারেন। এছাড়াও শরীরের প্রাকৃতিক অ্যান্টিবায়োটিকের চাহিদা পূরণ করতে ভেজানো কাঁচা ছোলার সাথে আদা খেতে পারেন।

খেয়াল রাখবেন আপনি যে পানিতে ছোলা ভিজিয়ে রেখেছিলেন তা একদমই ফেলে দিবেন না, ওই পানি সহ ছোলা খেয়ে ফেলবেন এতে করে আপনার শরীর ছোলাতে থাকা সকল ভিটামিন ও পুষ্টি পাবে।

রান্না করা ছোলা খাওয়ার উপকারিতা

ছোলা কাঁচা বা রান্না করে যেকোনো ভাবেই খাওয়া যেতে পারে। কাঁচা ছোলার মতো রান্না করা ছোলাও নানান পুষ্টিগুণে সমৃদ্ধ এবং এটিও শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে পারে। রান্না করা ছোলায় ক্যালোরির পরিমাণ বেশি থাকে, তাই যাদের শরীরে বেশি বেশি ক্যালোরির প্রয়োজন পড়ে এবং যারা শারীরিক পরিশ্রম করে তাদের জন্য রান্না করা ছোলা বেশ উপকারী।

ছোলা রান্নার পদ্ধতি ও খাওয়ার নিয়ম

অনেকেই শুধু লবণ জলে সিদ্ধ করে ছোলা খেয়ে থাকে। আবার কেউ কেউ এতে বিভিন্ন ধরনের তেল মশলা যুক্ত করে রান্না করে খায়। আমাদের দেশে স্ট্রিট ফুড গুলোতো ছোলার উপস্থিতি বেশ চোখে পড়ার মতো।

অনেকেই আবার ছোলার ডাল বানিয়ে খেয়ে থাকে। আপনিও নিশ্চয়ই ছোলা রান্নার পদ্ধতি সম্পর্কে জানেন, তাছাড়া ইউটিউবে তো এই ছোলা রান্নার কত রেসিপি আছে।

কাঁচা ছোলা না রান্না করা ছোলা? কোনটি বেশি উত্তম?

ছোলা রান্না হোক বা কাঁচা উভয় ক্ষেত্রেই এর পুষ্টিগুণ অনেক। তবে রান্না করা ছোলায় বেশিরভাগ সময় অনেক বেশি পরিমাণে তেল মশলা যুক্ত থাকে এতে করে দেহে পুষ্টি যে পরিমাণে প্রবেশ করে ঠিক সম পরিমাণে এতে থাকা তেল মশলা আপনার স্বাস্থ্যকে ঝুঁকিতেও ফেলে।

তাই কাঁচা ছোলা খাওয়াই উত্তম। তবে কাঁচা খেতে যদি অসুবিধা হয় বা আপনার শরীর এটিকে হজম করতে না পারলে আপনি সামান্য লবণ দিয়ে এটিকে সিদ্ধ করে খেতে পারেন।

খালি পেটে কাঁচা ছোলা খাওয়ার উপকারিতা

সকালে উঠে খালি পেটে ছোলা খেলে আপনার শরীর অনেক অনেক ভিটামিন, খনিজ লবণ ও পুষ্টি পাবে। চলুন জেনে নিই খালি পেটে ভেজানো কাঁচা ছোলা খেলে কি কি উপকার পাবেন-
  • ভেজানো ছোলা খেলে পেট অনেকক্ষণ ভরা থাকে, তাই ক্ষুধা কম লাগে এবং অন্যান্য খাবার কম খাওয়া হয় এতে করে শরীরের ওজন নিয়ন্ত্রণে থাকে।
  • আয়রনে সমৃদ্ধ ছোলা আপনার শরীরে হিমোগ্লোবিনের মাত্রা বাড়াতে সাহায্য করে।
  • ম্যাঙ্গানিজ, জিংক ও নানান ভিটামিনে ভরপুর কাঁচা ছোলা আপনার চুলের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এটি আপনার চুলকে করে স্বাস্থ্যোজ্জ্বল।
  • কাঁচা ছোলা খেলে আপনার শরীরে খুব সহজে বার্ধক্যের ছাপ পড়তে দেয় না।
  • ভেজানো কাঁচা ছোলা রক্তে সুগারের পরিমাণ কমায়, যা টাইপ ২ ডায়াবেটিসের ঝুঁকি কমাতে সাহায্য করে।
  • খালি পেটে কাঁচা ছোলা খেলে, এটি রক্তে খারাপ কোলেস্টেরলের মাত্রা কমিয়ে রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ ও হৃদরোগের ঝুঁকি কমাতে পারে।
নানান ধরনের পুষ্টি ও ভিটামিন পেতে চাইলে প্রতিদিন সকালে খালি পেটে কাঁচা ছোলা খাওয়া হতে পারে আপনার জন্য সর্বোত্তম পন্থা।

সিদ্ধ ছোলা খাওয়ার উপকারিতা

ছোলা কাঁচা অবস্থায় আপনার শরীরের জন্য যেমন উপকারী সিদ্ধ অবস্থায়ও ঠিক তেমন উপকারী। নিচে সিদ্ধ ছোলার উপকারিতা উল্লেখ করা হলো-
  • প্রতিদিনের ডায়েটে সিদ্ধ ছোলা রাখলে তা আপনার ওজনকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে সাহায্য করে।
  • ক্ষুধা নিয়ন্ত্রণে সিদ্ধ ছোলার তুলনা হয় না। এতে থাকা প্রোটিন ক্ষুধা হ্রাসকারী হরমোনকে আরও একটিভ করে, ফলে কম ক্ষুধা লাগে
  • সিদ্ধ ছোলাতে থাকা ফাইবার ও প্রোটিন রক্তে সুগারের পরিমাণ বাড়তে দেয় না, তাই ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে থাকে।
তাই আপনারা চাইলে খুব সহজেই একটু ছোলা সিদ্ধ খাওয়ার মাধ্যমে শরীরকে সুস্থ রাখতে পারেন।

ছোলার ক্ষতিকর দিক

বলা হয়ে থাকে অতিরিক্ত কোনো কিছুই ভালো নয়। ছোলার ক্ষেত্রেও তাই, এটি পরিমিত পরিমাণে খেলে আপনার শরীর নানান রকম পুষ্টি পেলেও, পরিমাণে বেশি খেলে এটা আপনার শরীরের জন্য বেশ ক্ষতিকর হয়ে উঠতে পারে।‌

দেখে নিন ছোলার ক্ষতিকর দিকসমূহ এবং কোন কোন ক্ষেত্রে ছোলা আপনার জন্য ক্ষতিকর হয়ে ওঠে-
  • প্রতিদিন ২৫ থেকে ৩০ গ্রামের বেশি ছোলা খাওয়া একজন সুস্থ মানুষের ক্ষেত্রে বেশ ক্ষতিকর।
  • আপনি ক্যান্সার বা আলসারের রোগী হলে এবং আপনার ওজন বেশি হলে অতিরিক্ত তেল মশলা দিয়ে ছোলা ভুনা খাওয়া থেকে বিরত থাকবেন। এটা আপনার শরীরের জন্য অত্যন্ত মারাত্মক।
  • আপনার শরীর যদি কাঁচা ছোলা হজম করতে না পারে, তাহলে এটি খাওয়া আপনার জন্য ক্ষতিকর হয়ে ওঠে এবং এর ফলে পেটের বিভিন্ন ধরনের সমস্যা দেখা দিতে পারে।
  • বেশি পরিমাণে কাঁচা ছোলা খেলে আপনার বমি হতে পারে।
  • কাঁচা ছোলা ভেজে খাওয়া কোনো অবস্থাতেই ঠিক নয়। কারণ এটি দেহের উচ্চ রক্তচাপ বাড়ায় ও শরীরের ওজন বাড়ায়।
  • আপনি শারীরিক পরিশ্রম কম করলে, আপনার জন্য ছোলা না খাওয়াই উত্তম।
ছোলার ক্ষতিকর দিক থাকার পরেও বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এটা বেশ উপকারী ভূমিকা পালন করে। তাই নিয়ম মেনে ছোলা খাওয়া অত্যন্ত জরুরী।


FAQ's

Q. প্রতিদিন কতটুকু ছোলা খাওয়া উচিত?

একজন সুস্থ স্বাভাবিক মানুষের প্রতিদিন ২৫-৩০ গ্রাম ছোলা খাওয়া উচিত। এর চেয়ে বেশি খেলে উপকারের চেয়ে অপকারই বেশি করবে।

Q. ইফতারে ছোলা ভুনা খাওয়া কি ঠিক?

সারাদিন না খেয়ে থাকার পর ইফতারে সামান্য পরিমাণে ছোলা তথা বুট ভুনা খেলে আপনার শরীরে আমিষের চাহিদা পূরণ হয়। আর এটা আপনার শরীরের জন্যও উপকারী।

Q. কাঁচা ছোলা নাকি সিদ্ধ ছোলা?

ছোলা কাঁচা বা সিদ্ধ যেকোনো ভাবে খেলেই উপকৃত হবেন। তবে কাঁচা ছোলা খেতে অসুবিধা হলে সিদ্ধ ছোলা খেতে পারেন।

Q. ১০০ গ্রাম রান্না করা ছোলাতে কতটুকু ক্যালরি থাকে?

গবেষণা মতে, ১০০ গ্রাম ছোলাতে ৩৭২ কিলোক্যালরি থাকে। এছাড়াও থাকে ৫.৬ গ্রাম চর্বি, ৬০ গ্রাম প্রোটিন ও প্রচুর পরিমাণে ফাইবার।

Q. ভাঁজা ছোলা খেলে কি ওজন বাড়ে?

হ্যাঁ, ভাঁজা ছোলা খেলে ওজন তো বাড়বেই সাথে উচ্চ রক্তচাপও বেড়ে যায়।

উপসংহারঃ‌
ছোলা কাঁচা, সিদ্ধ বা ভুনা যেভাবেই খান না কেন, সঠিক পরিমাণ ও নিয়ম মেনে খেলে এটা আপনার শরীরের জন্য অত্যন্ত ভালো। কিন্তু আপনি যদি ছোলার ক্ষতিকর দিক গুলো মাথায় না রাখেন, নিজের ইচ্ছে মত যদি খেয়েই যান তাহলে উপকৃত হওয়া তো দূরের কথা উল্টো নানান ধরনের সমস্যার সম্মুখীন হবেন।

তাই ছোলা খাওয়ার ক্ষেত্রে যথেষ্ট সচেতন হোন, রাস্তার ধারে কিংবা সারাদিন রোজা রেখে ইফতারে ছোলাযুক্ত কোনো খাবার দেখলেই খাওয়ার জন্য তাড়াহুড়ো করবেন, নিজের স্বাস্থ্যের সুস্থতা আপনার নিজের হাতেই। আগে মাথায় রাখুন আপনি যা খেতে যাচ্ছেন তা আপনার শরীরের জন্য কতটুকু নিরাপদ।

লেখকের পরামর্শ
ব্যাক্তিগত ভাবে আমি নিজে প্রচুর পরিমাণে ছোলা খেতে পছন্দ করি। আমার কাছে ছোলা ভুনা অনেক প্রিয় কিন্তু অতিরিক্ত তেল মশলা থাকায় আমি দিন দিন আমার অভ্যাসকে পরিবর্তন করতেছি। একেবারে কাঁচা ছোলা খাওয়ার অভ্যাস গড়ে তোলা আমার জন্য সহজ হয়ে উঠবে না, তাই আমি এখন তেল মশলা ছাড়া শুধু মাত্র সামান্য লবণ যুক্ত সিদ্ধ ছোলা খাওয়ার অভ্যাস করতেছি। আর এভাবে আমার আস্তে আস্তে কাঁচা ছোলা খাওয়ার অভ্যাসও গড়ে তুলবো।

এই পোস্টটি পরিচিতদের সাথে শেয়ার করুন

পূর্বের পোস্ট দেখুন পরবর্তী পোস্ট দেখুন